সত্যি বলতে কী, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসটা মোটেও কেবল শান্ত, অহিংস মিটিং-মিছিলের গল্প নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক আগুনের ইতিহাস, যেখানে বাংলার অসংখ্য যুবক-যুবতী হাতে অস্ত্র তুলে নিতে দ্বিধা করেননি। আর সেই অগ্নিযুগের অন্যতম প্রধান পুরোধা কে ছিলেন জানেন? তিনি হলেন আমাদের মাস্টারদা সূর্য সেন—যিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, সংগঠক এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণের স্বপ্নদ্রষ্টা।
মাস্টারদা! নামটা শুনলেই কেমন যেন একজন সাদাসিধে শিক্ষকের ছবি মনে আসে, তাই না? চট্টগ্রামের সেই স্কুলের শিক্ষকই কিন্তু এক রাতে ব্রিটিশদের চোখে ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। তিনি শুধু শেখাননি, দেখিয়েছিলেন—সাহস থাকলে আর দৃঢ় সংকল্প থাকলে, সামান্য ক’জন মানুষও দুনিয়া কাঁপিয়ে দিতে পারে। তাঁর অবদান নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা কথা বলতেই হয়, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন তো কেবল একটা ঘটনা নয়; এটা ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষার চূড়ান্ত ঘোষণা। চলুন, মাস্টারদার সেই লড়াকু জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আমরা মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।
১. একজন শিক্ষক কেন বিপ্লবী হলেন?
সূর্য সেনের জন্ম ১৮৯৪ সালে, চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায়। ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি কেমন যেন একটা চাপা প্রতিবাদী মনোভাব ছিল তাঁর মধ্যে। কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময়ই তিনি বিপ্লবী বাঘা যতীনের কথা শুনেছিলেন। বাঘা যতীন বলতেন, "আমরা মরব, দেশ জাগবে।" এই কথাটা সূর্য সেনের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, শুধু অনুরোধ, আবেদন-নিবেদন বা অহিংস পথ দিয়ে এই শক্তিশালী ব্রিটিশদের তাড়ানো যাবে না। দরকার সশস্ত্র জবাব।
তিনি যখন ১৯১৬ সালের দিকে চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন তাঁর 'মাস্টারদা' উপাধিটা তাঁর পরিচয় হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই শিক্ষকই গোপনে গড়ে তুলছিলেন এক দুঃসাহসী বাহিনী। তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা বন্দুকের ভাষাই বোঝে। আর তাই, তাঁকে সেই ভাষাতেই কথা বলতে হবে। তিনি মনে করতেন, প্রতিটি ভারতীয় যুবকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সাহসটা জাগিয়ে তোলাই আসল কাজ।
২. 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'—এক অসম সাহসের জন্মকথা
বিপ্লবী দল তো অনেকেই গড়েছেন, কিন্তু মাস্টারদার দলটা ছিল একটু অন্যরকম। তিনি তাঁর বাহিনীকে একটা সত্যিকারের সেনাবাহিনীর আদলে সাজিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে যখন তিনি 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি' (IRA) গঠন করলেন, তখন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার: গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করে ব্রিটিশদের নাস্তানাবুদ করা।
এই দলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন একদল তরুণ, তেজস্বী মুখ—গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, নির্মল সেন এবং আরও অনেকে। আর নারীদের অংশগ্রহণের দিক দিয়ে দেখলে মাস্টারদার দল ছিল সময়ের চেয়েও এগিয়ে। কল্পনা দত্ত বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো মেয়েরা তাঁর কাছ থেকেই সরাসরি সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। মাস্টারদা শুধু নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ট্রেনার, যিনি এদের মনে স্বাধীনতার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
৩. ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩০: সেই 'মহাবিদ্রোহ'
চট্টগ্রামের সেই রাতের কথা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ হয়। ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩০। মাস্টারদার নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল—একযোগে ব্রিটিশ পুলিশ লাইন ও অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগারগুলো দখল করতে হবে।
প্ল্যানটা সত্যিই জাদুকরী ছিল:
প্রথমেই সমস্ত টেলিগ্রাফ আর টেলিফোন তার কেটে দেওয়া হলো। চট্টগ্রামের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন! যেন ব্রিটিশরা হঠাৎ করে এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি।
গণেশ ঘোষ ও লোকনাথ বলের নেতৃত্বে দলগুলো অস্ত্রাগার দখল করে নিল। যদিও দুর্ভাগ্যবশত তারা গোলাবারুদের খোঁজ পায়নি, কিন্তু হাতে এসেছিল প্রচুর রাইফেল।
আর সেই মুহূর্তে মাস্টারদার চোখে ছিল বিজয়ের হাসি। তিনি জাতীয় পতাকা তুললেন এবং ঘোষণা করলেন—'চট্টগ্রাম স্বাধীন!' কী দারুণ অনুভূতি, তাই না? এই স্বাধীনতা হয়তো বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, কিন্তু ব্রিটিশদের দেখিয়ে দিয়েছিল যে তাদের শাসন চিরস্থায়ী নয়।
৪. জালালাবাদ পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই
অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর মাস্টারদা তাঁর দল নিয়ে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন। চার দিন পরই, অর্থাৎ ২২শে এপ্রিল, ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাঁদের ঘিরে ফেলল। শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম কঠিন যুদ্ধ—জালালাবাদ যুদ্ধ।
অল্প কয়েকজন নিরস্ত্রপ্রায় বিপ্লবী, অন্যদিকে সুসজ্জিত ব্রিটিশ সেনা। এই যুদ্ধে মোট ১২ জন বিপ্লবী শহীদ হয়েছিলেন। ভাবুন তো, কত বড় বুকের পাটা ছিল তাঁদের! তাঁরা জানতেন, হয়তো হারতেই হবে, কিন্তু তাঁরা পিছু হটলেন না। এই যুদ্ধটা শুধু অস্ত্র দিয়ে জেতার যুদ্ধ ছিল না, এটা ছিল ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে 'আমরা ভয় পাই না' বলার যুদ্ধ। এই বীরত্বই কিন্তু পরের প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য আসল প্রেরণা হয়ে কাজ করেছিল।
এরপর থেকেই মাস্টারদা শুরু করলেন তাঁর গেরিলা জীবন। গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থেকে আক্রমণ চালানো, যা ব্রিটিশদের জন্য ছিল একটা চরম মাথাব্যথা। বিশেষ করে প্রীতিলতার নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের মতো ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, মাস্টারদার বাহিনী কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
৫. শেষ কথা: একজন কিংবদন্তির বিদায়
দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বিশ্বাসঘাতকের জন্য মাস্টারদাকে ধরা পড়তে হলো। এর পরের ঘটনাগুলো খুবই মর্মান্তিক। ব্রিটিশরা তাঁর ওপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল। তবুও তিনি আদর্শ থেকে এক চুলও নড়েননি।
১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা এতটাই ভীত ছিল যে তারা তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার পরও তাঁর মৃতদেহ গোপন রেখেছিল এবং তা সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিল। কেন? যাতে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি না হয়, যাতে তাঁর আত্মত্যাগ অন্যদের বিপ্লবী হতে সাহস না যোগায়। কিন্তু তারা বোঝেনি, মাস্টারদা শুধু একটি শরীর নন, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ। মৃত্যুর ঠিক আগে তাঁর লেখা শেষ চিঠিটা যেন আজও আমাদের কানে বাজে: "বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! স্বাধীনতা আসবেই।"
উপসংহার
মাস্টারদা সূর্য সেনের অবদান বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য এক বিরাট গর্বের জায়গা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সাহস আর সংগঠন থাকলে যেকোনো অসম্ভব কাজ সম্ভব করা যায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়, তা ছিনিয়ে নিতে হয়। তাঁর নেতৃত্বে যে বিপ্লবী চেতনা তৈরি হয়েছিল, তা শুধু চট্টগ্রামেই নয়, পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার পিছনে মাস্টারদা সূর্য সেনের মতো কিংবদন্তিদের সেই রক্ত আর আত্মত্যাগ লুকিয়ে আছে। তাঁর এই ত্যাগকে আমরা কখনোই ভুলতে পারব না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন